সোমবার ০৫, অক্টোবর ২০২৬

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

মালয়েশিয়া সফরের আগে নিয়োগ সিন্ডিকেট বিলুপ্তির দাবি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:১৩ এএম

1702

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়া সফরের আগেই দেশটিতে শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের শোষণমূলক ও একচেটিয়া সিন্ডিকেট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার জোর দাবি জানিয়েছে অভিবাসী অধিকার বিষয়ক সংগঠন মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক (এমডব্লিউএন)। সংগঠনটি স্পষ্ট করে বলেছে, কুখ্যাত এই নিয়োগ সিন্ডিকেটের অবাধ অনিয়মের কারণে মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার সরল-সোজা শ্রমিক চরম ঋণদাসত্ব, প্রতারণা ও পাশবিক শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন।

আজ বুধবার (১৭ জুন) সকালে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মুখ সড়কে আয়োজিত এক বিশাল ও শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে ভুক্তভোগী পরিবার ও সংগঠনের নেতারা এসব যৌক্তিক দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে আয়োজিত সমাবেশে এমডব্লিউএন-এর কেন্দ্রীয় সচিব নিরঞ্জন মূল বক্তব্য ও দাবিদাওয়া উপস্থাপন করেন।

সমাবেশে এমডব্লিউএন-এর সচিব নিরঞ্জন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের অন্ধকার দিক তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রম অভিবাসন করিডোরে দীর্ঘদিন ধরে গভীর অনিয়ম, চরম বৈষম্য, পদ্ধতিগত শোষণ ও লাগামহীন আর্থিক দুর্নীতি চলে আসছে। মালয়েশিয়া সরকার বিশ্বের প্রায় ১৪টি উৎস দেশ থেকে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সাধারণ শ্রমিক আমদানি করলেও, শুধুমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে কয়েকটি নির্বাচিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে একটি সীমিত ও চক্রনির্ভর সিন্ডিকেট ব্যবস্থা কার্যকর করে রাখা হয়েছে। এই মাফিয়াতুল্য একচেটিয়া বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কৃত্রিমভাবে মালয়েশিয়াগামী গরিব মানুষের অভিবাসন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। এর ফলে অনেক সাধারণ শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে প্রায় ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত বৈধ অভিবাসন ব্যয় মাত্র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা।’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই বিপুল পরিমাণ অন্যায্য অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের হাজারো তরুণ উচ্চ সুদে চড়া ঋণ নিতে অথবা নিজেদের শেষ সম্বল ও পারিবারিক জমিজমা বন্ধক রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, কলিজা ফেটে যায় যখন দেখি জমিজমা বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরও বাংলাদেশি শ্রমিকদের সেখানে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানামুখী চরম ভোগান্তি ও বৈষম্য পোহাতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান অপরাধ হলো— সেখানে পৌঁছামাত্রই নিয়োগকর্তা কর্তৃক শ্রমিকের মূল পাসপোর্ট অবৈধভাবে জব্দ করে রাখা, প্রতিশ্রুত নিয়মিত মাসিক বেতন না দেওয়া বা নামমাত্র কম বেতন দেওয়া, বিশ্রামের সুযোগ না দিয়ে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা খাটানো, পশুর মতো অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি আবাসন ব্যবস্থা, সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে দালালের মাধ্যমে পাচার করা, অনিয়মিত আউটসোর্সিং কোম্পানির অধীনে দৈনিক মজুরিতে খাটানো, যথাসময়ে ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) নবায়ন না করা এবং অসুস্থ অবস্থায় ন্যূনতম চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা। এর ফলে বহু শ্রমিক সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে মালয়েশিয়ায় গেলেও, পরবর্তীতে দালাল ও নিয়োগকর্তার গাফিলতির কারণে নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই রাতারাতি অনথিভুক্ত বা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। আর এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তারা স্থানীয় প্রশাসনের অন্যায় আটক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়াবহ চাঁদাবাজি, জেল-জরিমানা, দেশে পুশব্যাক বা বহিষ্কার এবং জোরপূর্বক দাসত্বের চরম ঝুঁকিতে জীবন কাটাচ্ছেন।

এমডব্লিউএন-এর সচিব জানান, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসন করিডোরের এই অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিগত ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নির্মম শোষণ ও পদ্ধতিগত অপরাধীকরণের বিষয়ে প্রথম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে গত ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর বিশ্বমঞ্চে একই ধরনের উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মোর্চা এই মানবতাবিরোধী সিন্ডিকেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাধিকবার কঠোর বিবৃতি ও উদ্বেগ জানিয়েছে।

শ্রমিকদের টেকসই অধিকার রক্ষায় মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে এমডব্লিউএন-এর পক্ষ থেকে সরকারের নিকট সুনির্দিষ্ট সাত দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো
১. ত্রুটিপূর্ণ ও অকার্যকর বর্তমান বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী একটি বাধ্যতামূলক ও জবাবদিহিমূলক ‘দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তি’ স্বাক্ষর করা।
২. মানবপাচারকারী ও মধ্যস্বত্বভোগী সকল রিক্রুটিং এজেন্সির নিয়োগ সিন্ডিকেট চিরতরে বিলুপ্ত করা এবং সকল লাইসেন্সধারী এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ রাখা।
৩. মালয়েশিয়ায় বর্তমানে অবস্থানরত সকল অনথিভুক্ত ও সাধারণ ক্ষমার আওতাভুক্ত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দ্রুততম সময়ে বৈধতার আওতায় আনা।
৪. দালালের খপ্পরে পড়ে শোষণের শিকার হওয়া অসহায় শ্রমিকদের বকেয়া সম্পূর্ণ মজুরি ও আইনি ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা।
৫. আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পাসপোর্ট জব্দ করা এবং জোরপূর্বক শ্রম আদায় বন্ধে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
৬. কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও সেবার মান বৃদ্ধি করা।
৭. সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) উচ্চপর্যায়ের তদারকিতে অভিবাসী শ্রমিকদের যেকোনো জরুরি অভিযোগ তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির জন্য একটি স্থায়ী ও স্বাধীন সেল গড়ে তোলা।

এমডব্লিউএনের নেতৃবৃন্দ ও সমবেত সদস্যরা দুই দেশের নীতি নির্ধারকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই গুটিকয়েক রিক্রুটিং এজেন্সির অন্যায্য নিয়োগ সিন্ডিকেটই মূলত আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন সংকট, দফায় দফায় মালয়েশিয়া সরকারের শ্রমবাজার স্থগিতাদেশ, হাজারো তরুণের সর্বনাশা ঋণদাসত্ব এবং আধুনিক জোরপূর্বক শ্রমের অন্যতম প্রধান ও মূল কারণ। সংগঠনটি অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার, দেশের সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন অংশীদারদের সাথে সুসমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, শতভাগ স্বচ্ছ এবং মানবিক অধিকারভিত্তিক আধুনিক শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানাচ্ছে।

আজকের এই অধিকার আদায়ের মানববন্ধনে এমডব্লিউএন-এর বাংলাদেশ শাখার বিপ্লবী সভাপতি ওমর ফারুকসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং মালয়েশিয়া ফেরত অসংখ্য সর্বস্বান্ত ভুক্তভোগী শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন।

Link copied!