সোমবার ০৫, অক্টোবর ২০২৬

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

 মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে: মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

1705

মিঠাপানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নতুন ভ্যাকসিন প্রকল্প

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে দেশের নদী-নালা ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে দেশীয় মিঠাপানির মাছের অনেক প্রজাতি এখন চরম বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ পুনরুদ্ধারে নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

আজ বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর খামারবাড়িস্থ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) প্রধান অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) উদ্যোগে ‘মিঠাপানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্পের ইনসেপশন ওয়ার্কশপে (উদ্বোধনী কর্মশালা) প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন।

মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশের পুষ্টি ও অর্থনীতিতে মাছের অবদান তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের মৎস্যখাতে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। তবে এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। মৎস্য গবেষণার মাধ্যমে যারা জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন, সরকার সেইসব কৃতি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিশেষভাবে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের গুণীজন, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে বদ্ধপরিকর এবং নতুন নতুন জলজ প্রযুক্তি বিকাশে তাঁদের উদ্ভাবনী ভূমিকার দিকে গভীর প্রত্যাশার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।’

গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘বাংলাদেশে বহুসংখ্যক উচ্চপর্যায়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকলেও দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে এখনো গবেষণার একটি সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র জাতীয় ধারা গড়ে ওঠেনি। দেশে যখন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কোনো গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তখন তার মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ফলাফল এবং নিজস্ব একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।’

তিনি মৎস্য বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আরও বলেন, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম যেকোনো জলাশয়ের পানির গুণগত মানই হলো মাছ চাষ ও বংশবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক নিয়ামক। পানিকে যদি জৈবিকভাবে মাছের শতভাগ উপযোগী করে তোলা যায়, তবে মাছের নানাবিধ মড়ক ও রোগবালাই অনেকাংশে এমনিতেই কমিয়ে আনা সম্ভব। এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে বিজ্ঞানী, গবেষক ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বিত ও নিবিড়ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

উদ্বোধনী কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘দেশের মানুষের দৈনন্দিন প্রোটিনের খাদ্যতালিকায় থাকা মিঠাপানির মাছকে সব ধরনের রোগমুক্ত রাখা এবং খামারিদের লোকসান কমাতে টেকসইভাবে মাছ সংরক্ষণের লক্ষ্যে মড়ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন (টিকা) উদ্ভাবনের এই আইটি উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।’ তিনি যোগ করেন, বাণিজ্যিক মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহামারি বা মড়ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।

একই সাথে দেশের মৎস্য চাষের একটি অন্ধকার দিক নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বেশি লাভের আশায় মাছ চাষে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের এক বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য, মানবদেহ ও সামগ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি গবাদিপশুর চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত কিছু কড়া অ্যান্টিবায়োটিকও মাছের বাণিজ্যিক খামারে অবাধে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ এই মারাত্মক অনিয়ম ও ভেজাল রোধে মৎস্য অধিদপ্তরকে দেশব্যাপী কঠোর নজরদারি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উচিত নিজ নিজ অর্পিত দায়িত্ব সম্পূর্ণ সততা, নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করা। যেহেতু সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের ও করের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তাই জনগণের প্রতি গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্রের সুযোগ্য সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। এ ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় মৎস্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদগণ।

Link copied!