মঙ্গলবার ০৬, অক্টোবর ২০২৬

০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম

প্রথমবারের মতো ইউএনএইচসিআর নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সভাপতি বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

1703

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) আন্তর্জাতিক নির্বাহী কমিটির (এক্সকম) ব্যুরোর সর্বোচ্চ সভাপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘ কার্যালয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানের নেতৃত্বে এই শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতির অঙ্গনে প্রিয় মাতৃভূমির জন্য একটি অনন্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনএইচসিআর-এর এই নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্বভার বুঝে নিয়েছেন। বিগত ১৯৫৯ সালে এই বৈশ্বিক সংস্থাটির নির্বাহী কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ ৬৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশ ব্যুরোর কোনো নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করার গৌরব অর্জন করল।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী চার সদস্যবিশিষ্ট এই নির্বাহী কমিটির ব্যুরো মূলত বিশ্বব্যাপী ইউএনএইচসিআর-এর সামগ্রিক মানবিক কার্যক্রমে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক অধিকার সংক্রান্ত জটিল বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি টেকসই রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ফলে বৈশ্বিক এই শীর্ষ নেতৃত্ব কাঠামোয় বাংলাদেশের সরাসরি অন্তর্ভুক্তি ও প্রধান হিসেবে আসন গ্রহণ বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে দেশের জন্য একটি অনন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরামর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এই পদের জন্য সর্বসম্মত আঞ্চলিক প্রার্থী হিসেবে এককভাবে মনোনীত হয়। পরবর্তীতে আফ্রিকার আলজেরিয়া এবং ইউরোপের অস্ট্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সেই মনোনয়নকে জোরালো সমর্থন জানায়। এর পর বিশ্বমঞ্চে নির্বাহী কমিটির ১১০টি সদস্য রাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন লাভ করে বাংলাদেশের এই আন্তর্জাতিক প্রার্থিতা ও সভাপতি পদটি চূড়ান্ত হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সভাপতির এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া বিশ্ব দরবারে দেশের মানবিক ভাবমূর্তি, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আস্থার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

উল্লেখ্য, দূরদর্শী পেশাদার কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত সুনামের সাথে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। তিনি এর আগে রোম, জেনেভা ও কলকাতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইতিপূর্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইউএনএইচসিআর-সহ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একই সময়ে তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) বিষয়ক সরকারের অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় টাস্কফোর্স’-এর সদস্য-সচিব হিসেবেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও গৃহযুদ্ধের কারণে বিতাড়িত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে নিজেদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে বিশ্বমঞ্চে এসব অসহায় মানুষের নিরাপদ, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের অকাট্য দাবিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে সবচেয়ে সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এই চলমান বাস্তবতায় ইউএনএইচসিআর-এর নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সর্বোচ্চ সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে বিশেষ কৌশলগত তাৎপর্য বহন করছে।

বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুত শরণার্থীর সংখ্যা ইতিহাসে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ঠিক একই সময়ে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কার্যক্রমগুলো মারাত্মক আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের মুখে পড়েছে। এমন একটি কঠিন ও জটিল বৈশ্বিক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের এই শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট মোকাবিলা, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সংহতি এবং উন্নত দেশগুলোর দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে বাংলাদেশের আইনি অবস্থানকে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী ও জোরালোভাবে তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউএনএইচসিআর-এর নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সভাপতির এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব লাভ মূলত বাংলাদেশের সুদীর্ঘ মানবিক মূল্যবোধ, মজলুম ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতি আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অনন্য অবদানের একটি অবিস্মরণীয় রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

Link copied!