প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
1708
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৪ পিএম
জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে মোট বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ রাখা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) জন্য, অথচ সিংহভাগ অর্থাৎ বাকি ৯৮ শতাংশ বরাদ্দই কুক্ষিগত করে রেখেছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি খাত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে এই হতাশাজনক তথ্য জানিয়েছে দেশের খ্যাতনামা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, সরকারের নীতিনির্ধারক প্রশাসনযন্ত্র এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভেতরে যে এখনো প্রাচীন আমলের জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক একধরনের মনমানসিকতা জেঁকে বসে রয়েছে, সেটির স্পষ্ট নেতিবাচক ইঙ্গিত এই বৈষম্যমূলক রাজস্বকাঠামো ও বাজেট বরাদ্দ থেকেই বেশ ভালোভাবেই পাওয়া যায়।
আজ বুধবার (১৭ জুন) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সিপিডি কার্যালয়ের মূল মিলনায়তনে ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কী পেল?’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গবেষণা সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই বাজেট পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল তথ্যবহুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তী।
মূল প্রবন্ধে দেখানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যৌথ বরাদ্দের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অঙ্কটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি মনে হলেও, সামগ্রিক জাতীয় বাজেটের অনুপাতে এই কৌশলগত খাতের অংশ কমে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের একক বরাদ্দ আগের চেয়ে কমে হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, যা বিগত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কম। অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ একলাফে বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ, যা মূলত দেশে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মেগা প্রকল্পগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে হয়েছে।
প্রবন্ধে সিপিডি উল্লেখ করে, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে চাঙ্গা করতে কিছু প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যেমন— সৌরবিদ্যুৎ খাতের জন্য আগামী ২০auto সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি শূন্য শতাংশ করহার বা কর অবকাশের (ট্যাক্স হলিডে) প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তারা তাঁদের বাসাবাড়ির সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধের বিপরীতে সরাসরি ৫ শতাংশ কর রিবেট বা বিশেষ ছাড় পাবেন। তা ছাড়া সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিলের কাঠামো এবং বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রিক কন্ডাক্টরের ওপর বর্তমানে বলবৎ থাকা ৬২ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ করভার কমিয়ে ২৬ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্ষেত্রে বর্তমান আমদানিকৃত করভার ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যেমন— সোলার ইনভার্টারের করভার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সোলার প্যানেলের আমদানিকৃত করভার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ২ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এ ছাড়া দূষণমুক্ত বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) চার্জিং স্টেশনে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও নিবন্ধন ফি উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। সরকারের এই সব কটি পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগকে সাধুবাদ ও স্বাগত জানিয়েছে সিপিডি।
তবে প্রবন্ধের অন্য অংশে সিপিডি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলে, বাজেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) অব্যাহতি সুবিধা আগের মতোই বহাল রাখা রয়েছে, যা একে আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে কম করযুক্ত জ্বালানি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কয়লা অনুসন্ধানে মাত্রাতিরিক্ত জোর দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটের এমন আত্মঘাতী ও দ্বিমুখী প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে সিপিডি প্রশ্ন তুলেছে, সরকার যখন মুখে বড় বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলছে যে বৈশ্বিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করা হবে না, তখন দেশের বাজেটে এলএনজি খাতকে কেন এভাবে উত্তরোত্তর অন্যায্য প্রণোদনা ও সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? নতুন করে কয়লা অনুসন্ধানের ক্ষতিকর লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কয়লা আমদানিকারক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত একতরফা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মনে করে সংস্থাটি।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নীতিনির্ধারকদের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমাদের সরকার বাইরের দিক থেকে লোকদেখানো একরকমের পরিবেশবান্ধব প্রণোদনা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদের আসল বাণিজ্যিক পছন্দ এখনো সেই নোংরা জীবাশ্ম জ্বালানিই রয়ে গেছে।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি দেশের দীর্ঘদিনের রাজস্ববৈষম্য উতরাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় তাঁরা ইতিবাচক পরিবর্তন ও শুল্ক হ্রাস দেখছেন, কিন্তু সামগ্রিক রাজস্ববৈষম্য এখনো অব্যাহত রয়েছে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানিকে ঢালাও সুবিধা দেওয়া, এলএনজিকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া এবং কয়লা ও জ্বালানি তেলকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া এই জায়গাগুলো অবিলম্বে কমানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ এই মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্টের জেনারেল সেক্রেটারি মনোয়ার মোস্তফা এবং ইডকলের চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ জাবেদ ইমরানসহ দেশের জ্বালানি খাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞগণ।